দেবকান্ত ও ডালিয়া সরকার। ব্যারাকপুর। ১২ জানুয়ারি, ২০২১।#
চারিদিকে কলকারখানা ঘেরা তিলোত্তমা শহরের মাঝে বিস্তীর্ণ এলাকা, যেখানে যতদূর চোখ যায় শুধু জলাজমি আর কচুরিপানা। গত কয়েক মাসে গৃহবন্দী কিছু মানুষের একঘেয়ে জীবনে এটাই যেন হয়ে উঠেছে স্বর্গ। দলে দলে এসে মানুষ ভিড় করেছে গ্রাম্য দৃশ্য দেখার জন্য, প্রকৃতিকে উপভোগ করার জন্য। ব্যারাকপুর থেকে শুরু করে একদিকে বারাসাত, অন্যদিকে শ্যামনগর অবধি প্রায় ১০০ একরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বরতির বিল। বর্তমানে পক্ষীপ্রেমীদের কাছে বেশ লোভনীয় জায়গা হলেও জায়গাটির মূল আকর্ষণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে বনাঞ্চল, জলাজমি ও ঘাসজমি, যেগুলি বিভিন্ন পশুপাখির বিচরণ ক্ষেত্র।
যেমন: ব্লুথ্রোট (Bluethroat), সাইবেরিয়ান রুবিথ্রোট ( Siberian rubythroat), লঙ্গ-লেগ্ড বাজার্ড (Long-legged buzzard), লেসার অ্যাডজুটেন্ট স্টর্ক ( Lesser adjutant stork), উলি-নেক্ড স্টর্ক (Woolly-necked stork), প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার (Paradise flycatcher), ব্ল্যাক-নেপ্ড মনার্ক (Black-naped monarch) ও অন্যান্য। এছাড়াও জাঙ্গাল ক্যাট (Jungle cat), গোল্ডেন জ্যাকেল (Golden jackal) এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং বাঘরোল থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
জায়গাটি প্রথম থেকেই বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে এসেছে। আগে শিকারিরা বিলের ওপর অনেক জায়গা জুড়ে নেট বিছিয়ে রাখত, নেটের কারণে তাতে বহু পাখি আটকা পড়ত এবং মারা যেত, পরে সেই পাখি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হত। বর্তমানে কলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা ‘হিল’ (H.E.A.L) এর সহযোগিতায় এই সমস্যার অবসান ঘটেছে।
আরেকটি গুরুতর সমস্যার মধ্যে রয়েছে জল দূষণ। এলাকাটির আশেপাশের শিল্পাঞ্চলের ফ্যাক্টরির নোংরা ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত জল এসে পড়ে এখানকার জলাভূমি গুলিতে। ফলে জলজ গাছ ও প্রাণীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে পরিযায়ী পাখিদের আগমন কমে গেছে। স্থানীয় পাখিদের সংখ্যাও অনেক কমে গেছে এবং তারা দূরে চলে গেছে।
সম্প্রতি আরেকটি সমস্যা লক্ষ্য করা গেছে, লকডাউনে ঘুরতে আসা লোকজনের ভিড় হওয়ায় যেভাবে পশুপাখিদের জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটেছে, তেমনি পরিবেশ দূষণের মাত্রাও অনেকটাই, বিশেষ করে প্লাস্টিক দূষণ ঘটেছে অনেক।
বরতির বিল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার একটি উল্লেখযোগ্য জলাভূমি। ব্যারাকপুরের মত একটি শিল্পাঞ্চলের বুকে জলাভূমিটি কিডনির মতন দাঁড়িয়ে একটি সুস্থ পরিবেশ এবং তার জীববৈচিত্রকে অক্ষুন্ন রাখছে। আরেকটি উল্লেখ্য বিষয়, এখানকার চাষিদের মধ্যে যতটা সম্ভব পাখিদেরকে বিরক্ত না করে কাজ করার প্রবণতা দেখা গেছে। প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় আশা করা যায় এই জায়গাটিকে আরও দূষণমুক্ত ও মনোরম করা সম্ভব হবে।
Leave a Reply