শমীক। কলকাতা।#
ইএম বাইপাসে রুবি হাসপাতালের পেছনে আর্বানা নামক টাওয়ার-বাড়ি কমপ্লেক্স আর্বানার গেট থেকে কয়েকশো মিটার দূরে জলা জায়গায় একের পর এক গোডাউন। নাজিরাবাদের এরকমই এক ডেকোরেটর্সের গোডাউন আর ওয়াও মোমো-র গোডাউন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুন লেগেছিল পরশু রাত দুটোয়। আজ সকাল আটটা অব্দি ধোঁয়া বেরোচ্ছে। দমকলের অনেকগুলি গাড়ি। জল প্রচুর খেয়েছে, কিন্তু ছাইচাপা আগুন এখনও নেভেনি। এখনও অব্দি ৮ টা দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে। কাউকেও চেনা যায়নি। হলদিয়া যেতে কুকড়াহাটি পড়ে, সেখান থেকেই ১৩ জন নিখোঁজ, বললেন নিখোঁজ সুব্রত খাঁড়ার ভাই। ভাই আর ভাইপো দুজনেই নিখোঁজ। সেদিন রাতটা কাটিয়ে ভোরে ফেরার কথা ছিল। এরা ডেকোরেটর্সে ফুলের কাজে ছিল। এরকম আরো ছিল, রান্নার কাজের, প্যান্ডেলের কাজের, ঝালাইয়ের কাজের জনা আষ্টেক এসেছিল মুর্শিদাবাদ থেকে। দিনে পাঁচশ’ টাকা মাইনে, খাওয়া আর থাকা বলতে এই গোডাউনে প্যান্ডেলের সরঞ্জামের পাশে। এখন বিয়ের সিজন। ডেকোরেটর্সের জনা চল্লিশেক ছিল রাতে ওইসময়। দুই খেপ-এ রান্না হয় রাতে গোডাউনে। রাত দুপুরে রান্না বসে ভোরবেলা যে লেবাররা বিয়েবাড়ি সেরে ফেরে তাদের জন্য। সেইরকম রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার নাকি বার্স্ট করেছিল। সেই আগুনের ফুলকি এসে পড়ে পাশের ওয়াও মোমোর গোডাউনে। সেখানে দাহ্য পাম তেল ছিল। কিন্তু এ কথাও শোনা কথা, কিছু লেবার নাকি বলেছে এসব। চল্লিশ জনের মধ্যে চার পাঁচজন বেঁচে পালাতে পেরেছে। যারা পেরেছে, তারা আত্মগোপন করে আছে। এরকমই একজন কুকড়াহাটিতে গিয়ে খবর দেয়। মাথা ফেটে গেছিল তার। সেই অবস্থাতেই গেছিল বাড়ি, সেখান থেকে হাসপাতাল। কুকড়াহাটির যে লেবার-কন্ট্রাক্টর নিয়ে এসেছিল ১৭ জন লেবারকে সেখান থেকে, সেও নিখোঁজ, সম্ভবত মৃত। এরা সব ২-৩ বছর ধরে ডেকোরেটর্সের কাজ করে। টাটাতেও কাজে গেছে।

ডেকোরেটর্সের মালিক গঙ্গা দাস, কলকাতার সবচেয়ে বড়ো। এর আরো অনেক জায়গায় গোডাউন আছে। মেদিনীপুরে গোটা চারেক কলেজেরও নাকি মালিক। এই গোডাউনটা কয়েক বিঘা জলা জমি বুঁজিয়ে। মিডিয়ার লোকেরা ইস্যু করছিল এটা, শুনে স্থানীয় একজন স্বগতোক্তি করল, আর্বানাটাই তো জলা বুঁজিয়ে। তার বেলা? গঙ্গা দাসের ডেকোরেটর্সের এই গোডাউনে নাকি ৪০০ লেবারও থাকে মাঝে মাঝে। লোকমুখে শোনা গেল, পনেরোজন ম্যানেজার চালায় সবটা। মালিক মেদিনীপুরের কলেজ নিয়ে থাকে। যে রোস্টার খাতা মেনটেন করে লেবারেরা, সেও নিখোঁজ। কে যে পুড়ে মরেছে সেই কালরাতে, আর কে যে গা ঢাকা দিয়েছে, তা বোঝা যাবে না যতক্ষণ না জেসিপি এসে ছাইয়ের গাদা খুঁড়ছে। তবে তার আগে আসবে ফরেনসিক।

সভ্যতার গোডাউন আসলে জতুগৃহ, প্রভাতী সাইকেল সফর সেরে ফেরার সময় একথাই বলল সঙ্গী অনিলদা। আমি ভাবছিলাম, পাঁচশ’ টাকা রোজ-এ ডেকোরেটরের কাজ করতে এত দূর দূর থেকে এরা আসে! অনিলদা বলল, মাসে ১০-১২-১৫ হাজার, এটাই তো লেবারদের আয়। সে যে কাজই হোক। ঠিকই। পরিসংখ্যানও তাই। একশ’ দিনের কাজ উঠে গেছে বেশ কয়েক বছর। ফলে কম পয়সায় লেবার পাওয়াও বেড়েছে নিশ্চয়ই। আর-বাংলার এক সাংবাদিক অ্যাঙ্করিং করছিল লাইভ, “কর্মসংস্থান হচ্ছে মানছি, কিন্তু এইভাবে জলাজমির মধ্যে… ” – কিন্তু এর নাম কর্মসংস্থান? দাহ্যবস্তুতে ভর্তি ডেকোরেটর্সের গুদামে রাতে থাকা, সেখানেই সিলিন্ডার জ্বালিয়ে রান্না, দিন গেলে আয় পাঁচশ’ টাকা। পেটের দায়ে মেদিনীপুর মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা এসে বেঘোরে পুড়ে মরল যারা, তাদের এই সস্তার শ্রমেই তো আমাদের বিয়েবাড়িগুলো ঝকমক করে এই সিজনে!